লিখেছেন : ব্লগার চিরতার রস
গ্রামাঞ্চলে
বিয়ে বাড়িতে যখন ব্যাপক খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয় তখন গ্রামের সকল কুকুর
ওই বাড়িতে ভীর করে। বিয়ের বাড়ির লোকজনের কিছু অংশ নিয়োজিত থাকে সেই সব
কুকুরদের তাড়ানোর কাজে। কুকুরের অত্যাচার যখন চরমে পৌছায় তখন বাধ্য হয়ে
বিয়েবাড়ির লোকজন প্রচন্ড গরম পানি কুকুরের গায়ে ছিটিয়ে দেয়। তখন কুকুরগুলো
অর্তনাদ করতে করতে ঐ বিয়ে বাড়ি ত্যাগ করে এবং ভুলেও আর কোনদিন ঐ বাড়ির দিকে
আসেনা।
যারা গ্রামাঞ্চলের এসব ঘটনা নিজের চোখে দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই আমার সাথে
সহমত প্রকাশ করবেন। যাই হোক, এখন আমরা একটি ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যাব।
প্রসঙ্গটা হচ্ছে একটি দেশের উন্নয়ন বিষয়ক। আমরা যদি একটু গভীর ভাবে চিন্তা
করি তাহলে দেখতে পাব একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের মূলমন্ত্র নীহিত আছে
প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে। কেননা একটি শিশুর শিক্ষা এবং মানসিকতার সূচনা ঘটে
প্রাথমিক শিক্ষালাভের সময়। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পরেই এসব শিশুরাই একদিন
মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের বিভিন্ন
গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। এখন যারা উচ্চ পদস্থ পুলিশ, আইনজীবি, ডাক্তার,
ব্যবসায়ী তারা সবাই প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণের মধ্য দিয়েই তাদের শিক্ষাজীবনে
প্রবেশ করেছিলেন। তেমনি সরকারী দলের মন্ত্রী, এমপি এমনকি প্রধানমন্ত্রী,
রাষ্ট্রপতি মহোদয়গনরাও তার ব্যতিক্রম নয়। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ না
করে কেউই আজ এতো বড় হননি।
প্রসঙ্গটা আবারও একটু পরিবর্তন করার প্রয়োজন মনে করছি। এবার আমরা একটু
দৃষ্টিপাত করব প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে যারা মূল কারিগর তাদের নিয়ে। আমার জানা
মতে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাদান একটি অতি ধৈর্যের কাজ। কেননা তাদের কাজ করতে
হয় শিশূদের নিয়ে। আর আমরা সবাই অবুঝ শিশুদের আচার আচরণ সম্পর্কে সবাই
অবগত। আর এসব শিক্ষকরা তাদের অসীম ধৈর্য্য এবং আদরে কোমলমতি শিশুদের জন্য
একটি সুন্দর ও নির্মল ভবিষ্যৎ নির্মানের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেন। তার বদলে
তারা খুবই সামান্য পেয়ে থাকেন। তারা যে পরিমান ত্যাগ শিশুদের জন্য স্বীকার
করে থাকেন আমাদের মত একটি গরীবদেশের পক্ষ্যে তার মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব
নয়। কিন্তু তারপরেও বর্তমান পরিস্থিতি চিন্তা করে এবং চলমান
অর্থনীতির আচার ব্যবহার নিরুপন করে একটু সচ্ছল জীবনের গ্যারান্টি তাদের
দেয়া আমাদের সরকারের অবশ্য কর্তব্য। কেননা শিক্ষকরা ব্যক্তিগতভাবে ভাল না
থাকলে তার প্রভাব করবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর। আর এতে করে
আমরা জাতিগত ভাবে কোনদিনও উন্নতির মুখ দেখতে পারবনা। শিক্ষকরা
অর্থনৈতিকভাবে দুরাগ্রস্ত হলে তারা তাদের আদর্শ থেকে হয়তো সরেও যেতে পারেন।
কেননা অভাব অনটন মানুষের আদর্শের বিচ্যুতি ঘটাটে প্রধান একটি উপাদান
হিসেবে কাজ করে। উন্নত বিশ্বে শিক্ষকরা দারুনভাবে মূল্যায়িত হন। কিন্তু
আমাদের দেশে তারাই সবচেয়ে কম বেতনভোগি। এটা জাতিগতভাবে আসলেই খুব লজ্জার।
আর প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের তো আরো করুন অবস্থা। আমরা উন্নতবিশ্বের মত
মূল্যায়ন না করতে পারলেও একটি সম্মানজনক জীবন তো তাদের দিতে পারি। আর যে
সরকরারই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের উচিত এসব দিক সম্পর্কে একটু বেশি সচেতন
থাকা।
এখন আমরা একটু গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কিছু বৈশিষ্ট সম্পর্কে আলোচনা করব।
আমরা বাল্যকাল থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের প্রতিটি স্তরে গনতন্ত্রের সংজ্ঞা
পরেছি। তার বৈশিষ্ট্য এবং আচার আচনণও শিখেছি। যা যা শিখেছিলাম তার মূল কথা
হচ্ছে গনতন্ত্র হচ্ছে জনগণের সরকার। জনগনই সকল ক্ষমতার অধিকরী। জনগন তাদের
উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার জন্য তাদের পছন্দের কোন প্রতিনীধিকে ক্ষমতায়
বসায়। সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে থাকবে জনগণের স্বার্থ জড়িত। কিন্তু এসব
কেতাবি সংজ্ঞা বাস্তবে কতটুকু সফল এবং সত্য তা আজ সত্যিই আপত্তিকর একটি
বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। কেননা বিগত প্রতিটি সরকারের আমলে তাদের গ্রহণকৃত
স্বার্থবাজ পদক্ষেপসমূহের মধ্যে গনতন্ত্রের সংজ্ঞাটার আবশ্যিক মৃত্যু আমরা
লক্ষ্য করেছি। স্বাধীনতার পর থেকে এমন অনেক ঘটনার স্বাক্ষী আমাদের দেশের
সর্বস্তরের মানুষ। কারো কোন দ্বিধা দন্দ্ব থাকলে এমন অনেক ঘটনার
বর্ণনা আমি দিতে পারব যার মাধ্যমে এটাই প্রতিয়মান হবে যে বাংলাদেশে কখনই
একটি গনতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়নি। শুধূ মাত্র নামেই কয়েককার গনতান্ত্রিক
সরকার গঠিত হয়েছে। আমার মতে এখন গনতন্ত্রের সংজ্ঞা হওয়া উচিত- “গণতন্ত্র
হচ্ছে জনগনের ভোটে নির্বাচিত একটি একনায়ক সরকার ব্যাবস্থা।”
গণতন্ত্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। আপনি একটি
গনতান্ত্রিক দেশে স্বাধীনভাবে আপনার মতামত প্রকাশ করতে পারবেন। জনসমুক্ষে
আপনার দাবি দাওয়া প্রকাশ করতে পারবেন। গঠনমূলকভাবে আপনি যদি আপনার
দাবিদাওয়া গুলো প্রকাশ করেন তাহলে কোন গণতান্ত্রিক সরকার তাদের বাধা প্রদান
করতে পারবেনা যদি না তাদের দাবি দাওয়ার আন্দোলন জনগণের কোন ক্ষতির কারণ না
হয়। বর্তমান সরকারের আমনে বেশ কিছু আন্দোলন, সভা সমাবেশ বিরোধী বাধা আমরা
দেখেছি। তার প্রতিটিই ছিল বিরোধীদলের সভা সমাবেশ এবং আন্দোলনের বিরুদ্ধে।
তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত বা ঠিক না সঠিক তা নিয়ে আমি কোন আলোচনায় যাব না।
কেননা সরকার যুক্তি দেখিয়েছে এসব সভা সমাবেশের মাধ্যমে জনগণের জান মালের
ক্ষতি সাধিত হবে। কিন্তু শিক্ষকরা যখন তাদের দাবিদাওয়াগুলো শান্তিপূর্ণভাবে
সরকারের সম্মুখে তুলে ধরতে একত্রিত হন, তার বিরুদ্ধে বাধা প্রদান কেমনতর
ঘৃণিত এবং গর্হিত কাজ তা নিরুপন করা সম্ভবপর নয়। আর বাধা প্রদান করা করার
পদ্ধতিটাতো উপরে উল্লেখিত কুকুরঘটিত ঘটনার মতই। শিক্ষকদের তাড়াতে পুলিশ
ব্যবহার করল গরম পানি। যেটা একটি নোংরা এবং অমানবিক কাজ। শিক্ষকদের আমরা
যেখানে অতি শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে দেখি সেখানে সরকার তাদের সাথে কুকুরের
মতই ব্যবহার করল। এরকম গর্হিত কাজের মাধ্যমে সরকার জনগনের অন্তর থেকে তাদের
শ্রদ্ধার স্থানটা হারিয়ে ফেলতে পারেন। যা কখনই কাম্য নয়। তাই সরকারের কখনই
এমন নোংরা দমননীতি গ্রহণ করা উচিত নয়। তাহলে তারা জনগণ হতে একেবারেই
বিচ্যুত হয়ে যাবেন।
তাই সরকারের কাছে অনুরোধ আপনারা এমন নোংরা দমননীতি হতে বের হয়ে আসুন।
আপনারা জনগনের কথা শুনলে, জনগনের কথা ভাবলে জনগনও আপনাদের কথা ভবিষ্যতে
শুনবে এবং ভাববে। জনগণ হতে বিচ্যুত হয়ে কিছু দিন ক্ষমতায় টিকে থাকা
যাবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ভাবে টিকে থাকার একমাত্র পন্থা হবে জনগনের সেবা
এবং জনগনের সাথে চলার অভ্যাস করা।
পরিশেষে, বেসরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষোভ এবং
ঘৃণা প্রকাশ করছি। সরকারকে এমন ঘৃণিত কাজের জন্য শিক্ষকদের কাছে অবিলম্বে
ক্ষমা চাইতে হবে ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন