লিখেছেন: দিনমজুর
গ্যাস প্রাপ্তি মোটামুটি
নিশ্চিত এমন ৪টি ভূতাত্ত্বিক কাঠামো রাষ্ট্রীয় কোম্পানিকে বাদ দিয়ে জয়েন্ট
ভেঞ্চারের নামে চীন ও মার্কিন যৌথ কনসোর্টিয়ামের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিনোপ্যাক শেংলির নেতৃত্বাধীন ও মার্কিন
বেসরকারি কোম্পানি লংউডের যৌথ মালিকানাধীন “সিনোপ্যাক শেংলি-লংউড
কনসোর্টিয়াম” নামের এই কোম্পানির সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির খসড়ায় বলা
হয়েছে, কোম্পানিটি আর কোন সার্ভে ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখছে না
ফলে সরাসরি কুপ খননের কাজ শুরু করতে চায়:
“OPERATOR has acquired sufficient
regional data, the former UMC data, and outcrop surveys etc. and
indicated that further joint-study on the mentioned four structures will
be not needed. OPERATOR will skip joint-studies and start drilling
directly”
স্থলভাগের ২২ নং ব্লকের অন্তর্গত
পার্বত্য চট্টগ্রামের পটিয়া, সীতাপাহাড়, কাসালং, জালদি এই চারটি
ভূতাত্ত্বিক কাঠামো থেকে গ্যাস উত্তোলণ চুক্তির খসড়াটি বাপেক্সের বোর্ড
সভায় অনুমোদনের পর পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই
চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণে
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এবং
সম্প্রতি এই অঞ্চলের কাছেই পার্বত্য এলাকারই আরেকটি গ্যাস ক্ষেত্র সেমুতাং
থেকে সফল ভাবে গ্যাস উত্তোলণ করলেও, সরকার ১৩৯০০ বর্গ কিমি আয়তনের গ্যাস
ব্লকটির ৭০ ভাগ গ্যাসের মালিকানা চীন-মার্কিন কনসোর্টিয়ামের হাতে তুলে
দিচ্ছে।
ন্যাড়ার বারবার বেলতলা গমন:
কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার করে নাইকোর অবহেলায়
টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্রটি ধ্বংস হওয়ার পরও শাসক গোষ্ঠীর শিক্ষা হয় নি।
বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ আদালতে নাইকোর মামলার ঘানি টানা চলতে চলতেই আবার
আরেকটা বিপর্যয় ও লুটপাটের আয়োজন করা হচ্ছে। সিনোপ্যাকের সাথে সম্ভাব্য
জয়েন্ট ভেঞ্চারের খসড়াটি তৈরী করা হয়েছে নাইকোর সাথে বাপেক্সের জয়েন্ট
ভেঞ্চারের আদলেই। নাইকোর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে নাইকোর অংশীদ্বারিত্ব ৮০%
এবং বাপেক্সর ২০% ছিল। সিনোপ্যাকের সাথে চুক্তির বেলায় বাপেক্সের
অংশীদ্বারিত্ব ৩০% এবং সাইনোপেকের ৭০%। নাইকোর মতোই সিনোপ্যাকের চুক্তিতেও
বাপেক্স স্লিপিং পার্টনার বা নিস্ক্রিয় সহযোগী অর্থাৎ স্বাক্ষী গোপালই
থাকবে। বাপেক্স কোন বিনিয়োগ করবে না বা গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলণে সরাসরি
অংশগ্রহণ ও করবে না। জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিতে সাধারণত দুই পার্টি তাদের
অংশীদ্বারিত্বের সমানুপাতে বিনিয়োগ করে এবং লাভ ও সেই অনুপাতে বিভক্ত হয়।
সিনোপ্যাকের সাথে চুক্তিটিকে জয়েন্ট ভেঞ্চার বলা হলেও কার্যত এটা উৎপাদন
অংশীদ্বারি চুক্তি থেকে আলাদা কিছু নয়। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই সমস্ত বিনিয়োগ
বিদেশী কোম্পানির, উৎপাদিত গ্যাস থেকে কস্ট রিকভারি বাবদ বিনিয়োগ উঠিয়ে
নেয়া ও লাভের গ্যাস বাগানোর বাধ্যমে ৭০-৮০ ভাগ গ্যাস বিদেশী কোম্পানি
বাগিয়ে নেয়।
কি আছে চুক্তির খসড়ায়:
পিএসসি চুক্তিগুলোর মধ্যে যেমন মিল ও ধারাবাহিকতা দেখা যায়,জয়েন্ট
ভেঞ্চারের চুক্তির বেলাতেও সেই ধারাবাহিকতা রক্ষার সিদ্ধান্তই জানা গেছে
বাপেক্স সূত্রে। এ হিসেবে নাইকোর সাথে করা বাপেক্সর পুর্বতন জয়েন্ট
ভেঞ্চার চুক্তিটির সাথে সিনোপ্যাকের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারের খুব বেশি
পার্থক্য নেই। খসড়া জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈশিষ্ট
এখানে আলোচনা করা হলো:
১) আর্টিক্যাল ২.৪ অনুসারে সমস্ত
বিনিয়োগ অপারেটর কোম্পানি সিনোপ্যাক এর,বাপেক্স কোন বিনিয়োগ করবে না।
উৎপাদিত গ্যাস ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম দ্রব্য ভাগা ভাগি হবে আর্টিক্যাল ২৪ এ
উল্ল্যেখিত ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপল বা বিনিয়োগের তুলনায় আয়ের অনুপাত
অনুসারে।
২) আর্টিক্যাল ২৪.৪.১ অনুসারে ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপল বা বিনিয়োগের তুলনায় আয়ের অনুপাত নির্ধারিত হবে নিম্নোক্ত সুত্র ধরে:
ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল(IM )= ক্রমবর্ধমান মোট আয়/ক্রম বর্ধমান মোট ব্যায়
৩) আর্টিক্যাল ২৪.৪
অনুসারে,ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান যদি ১ এর কম হয় অর্থাৎ বিনিয়োগের
তুলনায় আয় কম হয় (অর্থাৎ কস্ট রিকভারি না হয়),তাহলে উৎপাদিত গ্যাসের ৭০ ভাগ
পাবে সিনোপ্যাক এবং ৩০ ভাগ বাপেক্স। আয় বাড়তে বাড়তে বিনিয়োগের তুলনায় বেশি
হলে অর্থাৎ ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান ১ এর বেশি হলে বাপেক্সের ভাগ
বাড়তে থাকবে। যেমন বিনিয়োগের তুলনায় আয় যদি দেড়গুণের মধ্যে থাকে অর্থাৎ
ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান ১ থেকে ১.৫ এর মধ্যে থাকে, তাহলে বাপেক্সের
ভাগে জুটবে ৩৫% এবং নাইকোর ভাগে ৬৫%। এভাবে বাড়তে বাড়তে বিনিয়োগের তুলনায়
আয় ৩ গুণ বা তার বেশি হওয়ার পরই কেবল বাপেক্স সর্বোচ্চ ৫০% গ্যাস পেতে
পারে।
| টেবিল: সিনোপ্যাক-বাপেক্স জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস ভাগাভাগি |
৪) কুখ্যাত প্রডাকশন শেয়ারিং
কন্ট্রাক্ট্রেও গ্যাসের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করে দেয়া থাকে।
কিন্তু এই চুক্তির খসড়ায় গ্যাসের দাম নির্দিষ্ট করা হয় নি। দামের ব্যাপারে
আর্টিক্যাল ৭.২ এ বলা হয়েছে, সিঙ্গাপুর ভিত্তিক এশিয়া পেট্রোলিয়াম প্রাইস
ইনডেক্স(এপিপিআই) অনুযায়ী হাই সালফার ফুয়েল অয়েল(এইচএসএফও) ১৮০ সিএসটি’র
দামকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যাবহার করে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হবে। এর
জন্য বাণিজ্যিক ভাবে উত্তোলণ যোগ্য গ্যাস আবিস্কার হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে
পেট্রোবাংলাকে পেট্রোলিয়াম পারচেজ এন্ড সেলস এগ্রিমেন্ট (পিপিএসএ) করতে
হবে। অন্যথায় সিনোপ্যাক গ্যাস বাংলাদেশের মধ্যেই তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির
অধিকার পাবে।
৫) খসড়া চুক্তির আর্টিক্যাল ২৭.১৭ এ
অপারেটর সিনোপ্যাকের অদক্ষতা ও অবহেলার জন্য কোন বিপর্যয় ঘটলে “উপযুক্ত”
ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়েছে। আর্টিক্যাল ২৭.১৯ এ অপারেটরের বড় ধরণের
অবহেলার(গ্রস নেগলিজেন্স) জন্য গ্যাসের রিজার্ভ নষ্ট হলে তার ক্ষতিপূরণের
কথা উল্ল্যেখ করা হলেও ক্ষতিপূরণের হার কিংবা কৃষিজমি, পরিবেশ, প্রকৃতির
ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি খসড়ায়।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে প্রোডাকশন শেয়ারিং
কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি’র মতোই এই জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিতেও বিনিয়োগ বাড়িয়ে
দেখিয়ে,এক ক্ষেত্রের বিনিয়োগ আরেক ক্ষেত্র থেকে উসুল করে,পুরাতন যন্ত্রপাতি
নতুন বলে চালিয়ে দিয়ে ইত্যাদি নানান উপায়ে ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান ১
এর কম রাখা এবং ৭০/৮০ ভাগ গ্যাস বিদেশী কোম্পানি নিজের ভাগে নিয়ে নেয়ার
সুযোগ থাকে। সেই ৭০/৮০ ভাগ গ্যাস আবার কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশকে
বৈদেশিক মুদ্রায় বাপেক্সের উৎপাদন খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে
বাধ্য হয়।
একদিকে পেট্রোবাংলা বাগাড়াম্বর করে
মিডিয়ায় বিবৃতি দিচ্ছে কি ভাবে দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো “বিদেশি কোম্পানির
কাছে হস্তান্তরের প্রশ্ন ওঠে,তা বোধগম্য নয়” বলে অন্যদিকে ছলে-বলে কৌশলে
নানান ভাবে গ্যাস সম্পদ লুটপাটের আয়োজন জারি রাখছে। আসলে স্থলভাগে গ্যাস
উত্তোলণে বাপেক্সের যে দক্ষতা ও বিদেশী কোম্পানির চেয়ে কয়েকগুণ কম খরচে কাজ
করার যে উদাহরণ রয়েছে এবং জাতীয় সম্পদের মালিকানার প্রশ্নে সারাদেশে
পিএসসি চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে উঠেছে,তাতে স্থলভাগের গ্যাস
ক্ষেত্র নতুন করে পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে
দেয়াটাকে দেশবাসির কাছে কোন ভাবেই গ্রহণ যোগ্য করা যাবে না একথা শাসক
শ্রেণী ভালো ভাবেই বুঝে গেছে। তাই এখন ক্যাপাসিটির সমস্যা, কাঠামোর জটিলতা
ইত্যাদি নানান অযুহাতে বিদেশী কোম্পানির সাথে চুক্তি করা হচ্ছে । মূল কথা
হলো কন্ট্রাক্ট,জয়েন্ট ভেঞ্চার ইত্যাদি বিভিন্ন কৌশলে গ্যাস সম্পদ
বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার ধান্দা যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভাবে বা খাতাকলমে
গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর মালিকানা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাত থাকলেও কার্যত
বিদেশী কো্ম্পানির মুনাফার বাড়ানোর কাজেই লাগবে। তাই উৎপাদন অংশীদ্বারিত্ব
চুক্তি বা প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) এর মতোই চীন-মার্কিন
কোম্পানির সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিকেও রুখে দিতে হবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন