বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১২

‘উচ্চশিক্ষার ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র’: জাতি ও জনগণ বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী কর্মসূচি

আরশাদ আলী

মার্কিন রাষ্ট্রদূত সর্বপ্রথম যে তিনটি কাজকে গুরুত্বপূর্ণ বলে পরামর্শ দেয় তার অন্যতম হলো শিক্ষা অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার এই কৌশলপত্র। ‘উচ্চ শিক্ষার ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র’ বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ইউজিসি প্রণয়ন করে বিএনপি আমলে। বিশ্বব্যাংক এই খাতে ১৪০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে। ১/১১-এ পরবর্তী সরকারের উদ্দেশ্যে এর গুরুত্বপর্ণ দিকগুলো হলো:
১.    ছাত্র আন্দোলনের সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে কৌশলপত্রে চার পর্বে উচ্চশিক্ষার ‘সংস্কার’ বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে মঞ্জুরী কমিশিন। প্রস্তাবিত চার পর্ব হচ্ছে: প্রাথমিক পর্ব ২০০৬-২০০৭, স্বল্প মেয়াদী ২০০৮-২০১৩, মধ্য মেয়াদী ২০১৪-২০১৯ ও দীর্ঘ মেয়াদী ২০২০-২০২৬।
২.    এর আওতায় উচ্চশিক্ষায় ছাত্র সংখ্যা সীমিত করা হবে।
৩.    উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রীয় ভর্তুকী ধাপে ধাপে ৫০ শতাংশ হ্রাস করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে বাকী ৫০ শতাংশ ব্যয় বহন করতে হবে। এ আয় বাড়ানো হবে প্রধানত ছাত্রদের বেতন-ফি বাড়িয়ে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি, ভবন লীজ দিয়ে, ক্যাফে, সাইবার ক্যাফে, বই ইত্যাদির দোকান দিয়ে, নাইট শিফট চালু করে, কনসান্ট্যান্সি, গ্র্যাজুয়েট ট্যাক্স ও এলামনাইদের কাছ থেকে বাজেটের অর্থ আয় জোগান দেয়া হবে। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রমাগত বেতন ফি বাড়ানো হচ্ছে। নাইট শিফট চালু, দোকান মার্কেট করাসহ বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে। শিক্ষকরা এমনিতে নাইট শিফট, কনসালটেন্সি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এই পরিকল্পনা সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পঁজিবাদের জন্য ভাড়াখাটা স্কলারদের যোগান আরও নিশ্চিত করবে। এর বাস্তবায়ন স্বরূপ নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ আছে ৪টি। বেতন ও ভর্তি ফি হলো ২০২০০ টাকা এবং সেমিস্টার ফি বাবদ দিতে হবে ৫০০০ টাকা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বলা হয়েছে: বার্ষিক পরিচালনা ব্যয় নিরিখে বেতন-ফি নির্ধারিত করা হবে। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকী ক্রমশঃ তুলে নেয়া হবে এবং পঞ্চম বছর হতে শতভাগ ব্যয়ভার বিশ্ববিদ্যালয়কে বহন করতে হবে। এভাবে উচ্চশিক্ষার চূড়ান্ত বাণিজ্যিকীকরণ সম্পন্ন করা হচ্ছে। যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষার প্রাইভেটাইজেশান ছাড়া কিছু নয়। অথচ বেসরকারী-প্রাইভেট বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভর্তুকী দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে- প্রাইভেট শিক্ষা ব্যবসাকে আরো লাভজনক করার স্বার্থে। দরিদ্র মেধাবী ছাত্রদের জন্য থাকবে ঋণের ব্যবস্থা। কাজ করে এই ঋণ ফেরত দিতে হবে।

ইউজিসির এই কৌশলপত্র সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, শিক্ষাখাতকে একটি বিনিয়োগের মাধ্যম হিসিবে পেতে চায়। এই ভয়াবহ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যত ভয়াবহ।


৪.    এ পরিকল্পনার আওতায় অনধিক ৫০০০ ছাত্র সংখ্যার ক্ষুদ্রাকার ও অনাবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উপর জোর দেয়া হয়েছে। এবং আবাসিক হল নির্মাণ না করার সুপারিশ করা হয়েছে। তার কারণ হল যাতে ছাত্ররাজনীতি দানা বাঁধতে না পারে। এই কৌশলপত্র ছাত্ররাজনীতি বন্ধেরও সুপারিশ করে। যার কারণ তারা অন্যত্র উল্লেখ করে যে, ছাত্ররাজনীতির কারণে বেতন-ফি বৃদ্ধি করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। এ থেকে বোঝা যায় এ কৌশলপত্র মূরতঃ প্রগতিশীল ধারার রাজনীতিকেই সমস্যা হিসেবে মনে করে এবং তার বিনাশ কামনা করে। শুধু তা-ই নয়, শৃঙ্খলা রক্ষার নামে ক্যাম্পাস পুলিশ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। যার উদ্দেশ্য হলো ছাত্রদের উপর পুলিশি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
৫.    বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজানো হবে। নির্বাচন রীতির পরিবর্তে সার্চ কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগ দেয়া হবে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিকভাবে সিনিয়রিটির ভিত্তিতে ডীন নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। পাঠ্যক্রম, গবেষণার বিষয় ইত্যাদি ঠিক করার ক্ষেত্রে আমলা, ব্যবসায়ী, এনজিওদের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। যার অর্থ হলো সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের চাহিদামাফিক জ্ঞান চর্চা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে এই আমলা-ব্যবসায়ীরা। এভাবে একটি অগণতান্ত্রিক আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে। যেখানে সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের চাহিদা পূরণ সুনিশ্চিত করা যাবে।
৬.    এই সুপারিশ প্রণয়নকারীদের মধ্যে অধিকাংশই হলো বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আমলা ও এনজিও লর্ড। সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এম শমসের আলী, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ডিরেক্টর চেয়ারম্যান এম সবুর খান ও ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব গভর্ণর চেয়ারম্যান আবুল কাশেম হায়দারের মতো ব্যক্তিরা। সুতরাং তারা কার স্বার্থ দেখেছেন তা সহজেই অনুমেয়।
৭.    এই কৌশলপত্রের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটি হলো উচ্চ শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের স্বর্থে কেবল ব্যবসায়, তথ্যপ্রযুক্তি, কম্পিউটার ও প্রকৌশল শিক্ষার উপরইগুরুত্ব আরোপ কার হয়েছে। তারা সাম্রাজ্যবাদী বাজার অর্থনীতির ধারণা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগ করে ইতিহাস, দর্শন, মৌলিক বিজ্ঞান এবং সাহিত্য ও শিল্পকলার ভবিষ্যত নেই বলে সুপারিশ করেছে। কিন্তু আমরা জানি, একটি স্বাধীন জাতীয় বিকাশ ছাড়া কোন সমাজের বৈষয়িক ও আত্মিক অগ্রগতি সাধিত হতে পারে না। আর জাতীয় বিকাশের জন্য প্রয়োজন ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য-শিল্পকলা এবং মৌলিক বিজ্ঞান।

এভাবে একটি পরনির্ভরশীল, জাতি ও জনগণের স্বার্থ বিরোধী উচ্চশিক্ষার কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে- সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।

-----
সুতরাং, প্রতিক্রিয়াশীল কর্মসূচির বিপরীতে কেবল বেতন-ফি বিরাধী, কিংবা আন্দোলনকারীদের দমনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেই হবে না। সঠিক হবে না গুরুতর রাজনৈতিক ও বিপ্লবী কর্মসূচির প্রশ্ন এড়িয়ে কেবল অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা। বরং উচ্চশিক্ষার প্রশ্নে সাম্রাজ্যবাদ-আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় ও গণতান্ত্রিক উচ্চশিক্ষার কর্মসূচি প্রণয়ন করে তার আওতায় শিক্ষার সংগ্রামকে বেগবান করতে হবে।


(কাগজের কম্পাস থেকে অংশটি এখানে প্রকাশিত হলো)





'সাপ্তাহিক' নামক একটি পত্রিকায় সাম্রাজ্যবাদের দালাল, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান ড. নজরুল ইসলামের প্রকাশিত একটি সাক্ষাতকার পড়ুন:


‘কিছু খরচ তো শিক্ষার্থীদের বহন করতেই হবে’
ড. নজরুল ইসলাম
চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন
----------------------------------------------------------

সাপ্তাহিক : বেতন বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটছে এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ড. নজরুল ইসলাম : বেতন বৃদ্ধি নিয়ে যে অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে আমি সেটা বিস্তারিত জানি না। পত্রিকা পড়ে জেনেছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটা বেতন নির্ধারণ করেছে। সেটা শিক্ষার্থীরা মানেনি। আমি পত্রিকা পড়ে যেটা জেনেছি খুব বেশি বেতন বাড়ানো হয়নি। এ নিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। 
সাপ্তাহিক : এভাবে বেতন বৃদ্ধির কারণে এর আগেও দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত  হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ শিক্ষার কৌশলপত্রে আপনারা এ বিষয়টিকে জোর দিচ্ছেন?
ড. নজরুল ইসলাম : কিছু খরচ তো শিক্ষার্থীদের বহন করতেই হবে। কারণ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন তারা পড়ছে তখন অনেক টাকা খরচ করছে। সেই তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচ অনেক কম। কাজেই শিক্ষার্থীদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল খরচ একাই বহন করার ধারণা থেকে সরে আসছে। শিক্ষার্থীদের সংঘাতের পথ থেকে সরে এসে আলোচনা করতে হবে।
সাপ্তাহিক : কিন্তু তাতে তো অচলাবস্থা আরো বাড়বে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে করণীয় কি হতে পারে?
ড. নজরুল ইসলাম : সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কাঠামো একই। নতুন-পুরনো সব বিশ্ববিদ্যালয়েই একই হারে বেতন দেয়া হয়। একই খরচ হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বেতন কাঠামো একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম। বেতনের হার সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই হলে সংঘাতের সম্ভাবনা কমবে। বেতন বাড়াতে হলে একই সঙ্গে বাড়বে। কমলেও একই হারে কমবে।
সাপ্তাহিক : সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনের এই সামঞ্জস্যতার কথা বলছেন, সেটা কীভাবে করা সম্ভব?
ড. নজরুল ইসলাম : এ জন্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ, কমিশন, সরকার ও শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথভাবে সব দিক বিবেচনায় রেখে আলোচনা করতে হবে। খোলামেলা আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান করা সম্ভব। এটা করা না হলে এমন ঘটনা কমানো যাবে না।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম পলাশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন