শুক্রবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৩

আমারে আগুনে পুড়িয়ে মেরে কোন প্রেসনোট চাই না

নিরঞ্জন চন্দ্র রায়


কিছু দিন আগে আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকান্ডে শতাধিক শ্রমিক পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। তার জন্য দায়ী গামেন্টসের মালিকশ্রেণি। তারা আদিম ক্রীতদাসদের মতো শ্রমিকদের কারখানায় তালাবদ্ধ করে রেখেছে। তাদের কাছে শ্রমিকদের জীবনের কোন মূল্যই ছিল না। শ্রমিকরা বাঁচার জন্য আর্তনাদ করলেও পাষন্ডদের একটুও সহানুভূতি জাগেনি। তারা অবরুদ্ধ শ্রমিকদের মুক্ত করেনি। সেদিন পোড়া লাশের গন্ধে আশুলিয়ার বাতাশ ভারি হয়ে উঠেছিল। সেখানে ছিল লাশের মহড়া। আর এই ঘটনার অল্পকিছু সময়ের মধ্যেই আমাদের নীতিনির্ধারকরা, নেতা-নেত্রীরা, গার্মেন্টস মালিকরা সংবাদ সম্মেলন করে ‘শোক প্রস্তাব’ করেন, ‘শোকবার্তা’ পাঠান, তারা ‘শোকাহত’ হন! যাদের শ্রম শোষণ করে গার্মেন্টস মালিকরা অঢেল অর্থবিত্তের মালিক, সেই শ্রমিকদেরই জীবনের মূল্য নির্ধারণ করেন ১লক্ষ টাকা! শ্রমিকদের দক্ষ শ্রমশক্তির কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। আর সেই শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে মালিকশ্রেণির কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। শ্রমিকদের জীবনের মূল্য ১ লক্ষ টাকা, যা ক্রীতদাস প্রথাকেও ডিঙিয়ে গেছে। অথচ গার্মেন্টসে এই দুরবস্থার চিত্র ১৯৯০ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে প্রায় দুই যুগ ধরে। তারপরও এই শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যাথা ছিল না! তাদের নৈতিকতাবোধ ছিল সংবাদ সম্মেলন করে শোকবার্তা পাঠানো, আর জীবনের মূল্য ১ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করায় সীমাবদ্ধ! এমন অবস্থা ঢাকার বৌ-বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে, চট্টগ্রামে বহদ্দারহাটের ফ্লাইওভার ধ্বসসহ লাগাতার সড়ক দুর্ঘটনার নির্মম মৃত্যুগুলোয় যেন দেশটা মৃতের উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।

সমাজ-সভ্যতার সম্মুখমুখী অগ্রযাত্রাই হলো প্রগতি। মধ্যযুগীয় অন্ধকার ও কুপমন্ডুকতায় ফিরে যাওয়া নয়। অথচ গত ৯ ডিসেম্বর ২০১২ বিরোধী দলের হরতাল চলাকালে বিশ্বজিত নামের একজন পথচারীকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা দিনদুপুরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে। সে দৃশ্য বড়ো বেদনাদায়ক। দেখে মনে হল, আমরা এখনো মধ্যযুগীয় অন্ধকার ও কুপমন্ডুকতায় পড়ে আছি। আমাদের আইন-শৃক্সক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের টাকায় জীবিকা নির্বাহ করে অথচ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।

সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা দেশের সম্পদ তাদের প্রভুদের হাতে তুলে দিতে ব্যস্ত থাকে। সচেতন দেশপ্রেমিক জনগণ তার প্রতিবাদে রাজপথে মিছিল করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে জামাত-শিবির হরতালের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেয় এবং নির্মম-নৃশংস হামলা চালায়। পুলিশ তখন নির্বাক! তারা নাকি ‘সহনশীল’ মনোভাব নিয়ে থাকে! আমাদের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় আবার সেই কথা সংবাদ সম্মেলন করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার করেন! অথচ দেশের সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে যখন পুলিশের লাঠিচার্জ-টিয়ারশেল নিক্ষেপ হয়, তখন কোথায় থাকে পুলিশের সহনশীল মনোভাব! চারিদিকে আজ বুর্জোয়াদের যে দানবীয় তান্ডব চলছে তার জন্য দেশপ্রেমিক জনগণের উচিত এখনই সচেতন এবং সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সম্মিলিতভাবে এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে।


লেখক পরিচিতি: নিরঞ্জন চন্দ্র রায়, সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ শাখা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন