মতিউল ইসলাম, মির্জা কাদের। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের সাহসী অগ্রপথিক। ভিয়েতনামে মার্কিন সেনাদের বর্বরতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিঃশেষে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। উৎসর্গ করেছেন অনাগত ভবিষ্যতের জন্য, যে ভবিষ্যৎ সাম্যের, মুক্তির। দূরপ্রাচ্যের ভিয়েতনামিরা যখন নাপাম বোমায় ক্ষতবিক্ষত, হাজার মাইল দূরে থেকেও সে ক্ষতের বেদনা বুকে ধারণ করে, প্রতিবাদে শামিল হওয়ার মন্ত্র বৃথা হতে দেননি এ দুই মহানায়ক। লাঞ্চনা, বঞ্চনা, অন্যায় আর শোষণ দলে মাথা উচু করে মৃত্যুই যে নবজীবনের গান রচনা করে তা তারা প্রমাণ করেছিলেন।
তাদের সে অমর আত্মত্যাগ এখনো পেরণা যোগাচ্ছে লড়াইয়ের। যদিও পেরিয়ে গেছে ৪০ বছর। সাম্রাজ্যবাদের হিংস্রতা আরো তীব্র তীক্ষ হয়ে উঠেছে। দেশে দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নেওয়ার নগ্ন আস্ফালনে মত্ত তারা। সাম্রাজ্যের লাভের নিক্তিতে মানুষ আর প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত করে তুলছে বিপন্ন। এজন্য রক্তের হোলিখেলায়ও আপত্তি নেই সাম্রাজ্যবাদের। তাদের নির্দয় বেনিয়াগিরির অসভ্য লালসায় আজ ছিন্ন ভিন্ন আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, ফিলিস্তিনসহ তৃতীয় বিশ্বের শতকোটি মানুষ। সাম্রাজ্যবাদের উদ্যত রক্তচক্ষু এবার আফ্রিকা আর এশিয়ার দিকে। প্রাচ্যের শ্রম আর সম্পদ কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ৬০ভাগ সেনা মোতায়েনের নির্লজ্জ ঘোষণা দিয়েছে এ হায়েনারা।
সম্পদলোভী শকুনের হিংস্র দৃষ্টি থেকে একচুলও নিরাপদ নয় বাংলাদেশ। আমাদের দেশের বন্দর, তেল, গ্যাস, কয়লা আর প্রাকৃতিক সম্পদ দখলে মরিয়া তারা। সামরিক হুমকীর পাশাপাশি তাঁবেদার ক্ষমতা কাঠামো আর মুক্ত বাজার অর্থনীতির মারপ্যাঁচে একটু একটু করে গিলে নিতে চাইছে আমাদের স্বদেশ। আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সার্বভৌমত্ব, মনোজগত সবই করায়ত্ব করতে চায় আজকের সাম্রাজ্যবাদ। তবে যেখানেই ধ্বংসের মচ্ছব চলুক না কেন, পরাজিত হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। ভিয়েতনামের লাখো জনতাকে হত্যা করেও মানুষের শক্তির কাছে পদানত হয়েছে তাদের আধুনিক সমরাস্ত্র। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেরও তীব্র বিরোধিতা করেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু বাংলার মুক্তিকামী মেহনতি জনগণ তাদের রক্তচক্ষু উপড়ে ফেলে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ঠিকই ছিনিয়ে এনেছে।
আশার কথা, সাম্রাজ্যবাদ তার পতনের ঘন্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। সাম্প্রতিক মন্দা নাড়িয়ে দিয়েছে পুঁজির কেন্দ্র ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনীতির ভিত। সারাবিশ্বের সম্পদ শোষণ করে যে রাজপ্রাসাদ তৈরি করেছিল সাম্রাজ্যবাদ, সে প্রাসাদের প্রতিটি ইট আজ মানুষের অব্যাহত প্রতিবাদের মুখে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। পুঁজিবাদের ব্যর্থতা অন্যায়, আর শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে দিকে দিকে প্রতিবাদের দামামা বাজছে। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের দেয়ালে ঠেকা পিঠ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিউবা, ভেনিজুয়েলা, ল্যাটিন আমেরিকার সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়ছে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে সমগ্র দুনিয়ায়। নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় ৯৯ শতাংশ মানুষ মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের। 'শ্রেণি সংগ্রামই মানব মুক্তির একমাত্র পথ' তা আবারো দিশারী হয়ে উঠছে। মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে সমাজতন্ত্রের পতনের বুলি। ভোগবাদের ঠুলি উপড়ে ফেলে দেশে দেশে তরুণ-যুবারা শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে হচ্ছে একাত্ম। সেদিন আসলেই আর দূরে নয়, যেদিন পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে সাম্রাজ্যবাদ, মানুষ মুক্তি পাবে এ ঘৃণ্য অপশক্তির হাত থেকে।
১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি, মতিউল কাদেরের স্লোগানে-মিছিলে শামিল ছিলেন তিতুমীর, সুভাষ, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, সিধু-কানুরা। প্রতিবাদের আজকের লড়াইয়ে আমাদের চেতনায় মতিউল কাদেররা বারবার ফিরে আসুক।
প্রতিরোধ প্রতিশোধে নিশ্চিহ্ন হোক সাম্রাজ্যবাদ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন