মঙ্গলবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১০

শিক্ষানীতি প্রসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের প্রস্তাবনা

শিক্ষানীতি প্রসঙ্গ সমাজ ও জাতি বিনির্মানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের শিক্ষা-কাঠামো এবং নীতিগুলো জনসম্পৃক্ত বা জনগণতান্ত্রিক না হওয়ায় শিক্ষা আমাদের কাছে বোঝা, জাতি হিসেবে আমরা এখনো অজ্ঞ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোর আবির্ভাব ঘটেছে। সেই শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো কেরানী বানানো। তারা তাদের শোষণ বৈষম্য পাকাপোক্ত করতো ডিগ্রি দিয়ে। মুক্তবুদ্ধি, ¯^vaxb ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা থেকে জনসাধারণকে দূরে রেখে ব্রিটিশরা যে কাঠামোর শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলন ঘটিয়েছিলো তার ব্যত্যয় ঘটেনি পাকিস্তান আমলেও। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান শিক্ষা কনফারেন্সের সুপারিশমালা এবং ১৯৫৬, ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে তার স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায়। ১৯৫৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের যে সংবিধান গৃহীত হয় তাতে সংবিধান ও রাষ্ট্রকে ধর্মীয় বলে ঘোষণা করা হয়। শিক্ষাকমিশন রিপোর্টগুলোতে দ্বি-জাতিতত্ত্ব টিকিয়ে রাখা এবং শিক্ষাকে বড়লোকের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। পশ্চাদপদ আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, দেশী-বিদেশী শোষণ প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য উপযুক্ত প্রশাসনিক কারিগর তেরীর প্রক্রিয়া শিক্ষার কেন্দ্রে রাখার ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল ছিল ক্ষমতাসীন সামন্ততান্ত্রিক- ধর্মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও শাসকদের শ্রেণী ¯^v_©| পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে শ্রেণী বৈষম্যের পাশাপাশি আমরা জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিলাম।
ফলশ্রুতিতে পশ্চিম পাকিস্তানের ২২ পরিবার ও একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে এবং ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমরা নিবেদিত ছিলাম। যার চরম পরিণতি পাকিস্তান নামক সামপ্রদায়িক রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করে সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশে সংবিধানের আলোকে যে শিক্ষা দর্শন গৃহীত হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে শাসক গোষ্ঠীর বারবার পরিবর্তনের ফলে একেবারেই বদলে গেছে। ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই গঠিত ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে মুক্তিযুদ্ধের দর্শন প্রতিফলিত হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুস্পষ্ট বোধ শিক্ষার্থীর চিত্তে জাগ্রত করে তাকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। সংবিধানের চার মূলনীতির আলোকে জাতিগত, ধর্মীয়, সমপ্রদায়গত ও শ্রেণীগত নিপীড়নমুক্ত এবং বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়ার জন্য এই প্রতিবেদনকে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় পট-পরির্বতনের কারণে এই শিক্ষা প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখতে পায় নি। শিক্ষা সম্পর্কে পরবর্তীতে যে ৮ টি কমিশন (১৯৭৯ সালে অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষানীতি: জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদের সুপারিশ, ১৯৮৩ সালে শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থাপনা কমিশন, ১৯৮৬ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশন, ১৯৯৩ সালে প্রাথমিক ও গনশিক্ষা বিষয়ক টাস্কফোর্স, ১৯৯৬ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রনয়ন কমিটি, এরপর আরেকটি কমিটি গঠিত হয় যেটিকে পূর্বোক্ত রিপোর্ট প্রয়োগযোগ্য করার দায়িত্ব দেয়া হয়, ২০০২ সালে শিক্ষা সংস্কার বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং সর্বশেষ অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞার নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন) শিক্ষা বিষয়ক নীতি নির্ধারনীমূলক কাজ করেছে এবং কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সেগুলো মূলত শাসকশ্রেণীর শিক্ষা দর্শনকেই উপস্থাপন করেছে। সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র, ধর্মরিনপেক্ষতা বাদ দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে তুলে আনা হয়েছে। রাষ্ট্রের চরিত্র পাল্টে দিয়ে সমাজকে পেছনে ঠেলে দেয়ার জন্য এমন শিক্ষার বিস্তার ঘটানো হয়েছে যা আধুনিক ও আণবিক দৃষ্টিতে অপশিক্ষার নামান্তর। ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার পরিবর্তের শিক্ষাকে বাজারমুখী পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যের ধারণাও পুরোপুরি বলবৎ থেকেছে।
বর্তমান বাংলাদেশে ১৯৭৫-২০০৮ সাল পর্যন্ত শাসক শ্রেণী ধর্মকে সামনে রেখে তাদের লুটপাট এবং শোষণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। বর্তমানে যে শিক্ষা কাঠামো রয়েছে তাতে শিক্ষার সার্বজনীনতা, প্রগতিশীলতা, সৃজনশীলতা, প্রায়োগিকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ ধারণা অনুপস্থিত। ধনীর জন্য উচ্চমানের শিক্ষা ও গরিবের জন্য নিম্নমানের শিক্ষা এই বৈষম্য যেমন দিন দিন প্রকট হচ্ছে তেমনি কুশিক্ষা, বিকৃতি, বৈষম্য, বাণিজ্যিকীকরণ, যান্ত্রিকতা শিক্ষার সাথে যুক্ত হযে সমাজকে, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজনীতি ও শিক্ষার সঙ্গে ধর্মকে যুক্ত করে ধর্মের অপব্যবহারের ফলে শিক্ষা হচ্ছে সাম&প্রদায়িকতাপুষ্ট ও মধ্যুযগীয় ধ্যান-ধারণার বাহক।
সমাজে বৈষম্যকে স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। শিক্ষার শুরুতেই কিন্ডারগার্টেন এই বৈষম্যের গোড়াপত্তন নিশ্চিত করে। সার্বজনীন শিক্ষাকে ধ্বংস করার জন্য দারিদ্র্য এবং ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে তৈরি হয়েছে মাদ্রাসা। সেটিও আবার দুই ধরনের। আলীয়া মাদ্রাসা এবং কওমী মাদ্রাসা। মাদ্রাসা শিক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের সামপ্রদায়িক, জঙ্গী রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কওমী মাদ্রাসায় পড়ানো হয় না বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, গণিত কোনোকিছুই। পাশাপাশি উচ্চ বিত্ত সমাজে O- Level, A- Level পড়ানো এখন স্ট্যাটাসের অংশ। বহুধা বিভক্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আরো আছে ক্যাডেট শিক্ষা ব্যবস্থা, ক্যাডেট মাদরাসা, মহিলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বালক-বালিকা প্রাথমিক/ মাধ্যমিক/ উচ্চবিদ্যালয়; রয়েছে কোচিং ব্যবসা। এদের চাপে সাধারণ শিক্ষার অবস্থা সত্যিই অত্যন্ত করুণ।

একটি ¯^wbf©i বৈষম্যহীন প্রগতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে আমাদের শিক্ষা কাঠামোকে হতে হবে গণমুখী বিজ্ঞানীভিত্তিক। এটি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে অর্থনৈতিক এবং লৈঙ্গিক সবলতাই শিক্ষালাভের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা নয়। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্বশীল, জীবনমুখী, সৃজনশীল ও উৎপাদনমুখী মানুষ তৈরিই হয়ে ওঠে এ শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামোর বাইরেও শিক্ষার নানা মাধ্যম ও বাহন রয়েছে। শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনায় বিষয়গুলো গুরুত্বেরও দাবিদার। এর মধ্যে সংবাদপত্র, সাহিত্য, টেলিভিশন, সিনেমা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সভ্যতার সুচনাকাল থেকে মানুষ জীবন সংগ্রামে চলতে ফিরতে হাজার সমস্যা মোকাবেলা করেছে এবং এখনো করছে, যা থেকে সে অর্জন করে বুৎপত্তি। এটিও শিক্ষার আওতাভুক্ত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামোর বাইরে থাকায় এ প্রসঙ্গটি প্রায়শই আলোচিত হয় না। উৎপাদনের সাথে প্রাণের সম্পর্কে গ্রথিত, নিবিড়ভাবে একীভূত যে শিক্ষা যা প্রকৃতির কাছ থেকে গ্রহণ করে বংশ পরস্পরায় হস্তান্তর করেছে হয়তো আমাদের কোন কৃষক পূর্বপুরুষ, সেই অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও শিক্ষা ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত।

শিক্ষা খাতে ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী জাতীয় আয়ের ৮% বরাদ্দ দেয়ার কথা থাকলেও বিগত সরকারগুলো তা বাস্তবায়িত করেনি। অথচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মিগ-২৯ ও ফ্রিগেট কেনা হয়েছে যা দিয়ে ১০ বছরের জন্য ১৫ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ অথবা ৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা যেত। জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে উচ্চ শিক্ষার আবির্ভাব ঘটলেও এই ধারণা থেকে বিচ্যুত হয়ে দেশের বিদ্যমান উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষায়িত বা দক্ষতা উৎপাদনের শিক্ষা দানে নিয়োজিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুলনামূলক পাঠ্যসূচীর বদলে একপাক্ষিক পাঠ্যসূচী প্রবর্তন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তবুদ্ধি চর্চার অবাধ ক্ষেত্র হিসেবে এখন আর বিবেচিত হয় না। ক্ষমতাসীন শ্রেণীর বিরুদ্ধে যাতে কোনো প্রতিবাদ না হয় সেজন্য বসানো হয়েছে লাঠিয়াল বাহিনী। খুন-ধর্ষণ-সন্ত্রাস পরিকল্পিত ভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।

শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। প্রতিটি একেকটি ¯^Zš¿ বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিদার অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেই ন্যূনতম প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। বাজার মুখী BBA, MBA, Hotel Management, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ কিছু বিষয় নিয়ে এরা একেকটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার বিপরীতমুখী । শিক্ষা এখন সারাবিশ্বের এতো মূল্যবান পণ্য যে তৃতীয় বিশ্বের দেশটিতে হাজির হচ্ছে বিদেশী দামী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। এরা বেতনও নিচ্ছে ডলার স্কিমে। উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা তথৈবচ। পরিসংখ্যানিক চিত্রের বাইরেও শিক্ষা পদ্ধতির ত্রুটির কারণে ক্রমবর্ধমান নকল প্রবণতা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে ঘুষ, দুর্নীতি, অস্ত্র-সন্ত্রাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যে অংশ শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত তাদেরকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে কুশিক্ষা, বিকৃতি ও কুপমণ্ডুকতার অন্ধকারে। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে দেশজ সংস্কৃতি লালনে অনীহা, অন্ধ অনুকরণের ফলে সমাজের মধ্যে হতাশা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার অনিবার্য ফলাফল- জাতিগতভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত হচ্ছে।

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলী

শিক্ষা ব্যবস্থা একটি জাতির আশা আকাঙ্খা রূপায়ণের ও ভবিষ্যত সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার। কাজেই দেশের কৃষক, শ্রমিক মধ্যবিত্তসহ সকল শ্রেণীর জনগণের জীবনে মানবিক গুনাবলীর সৃজন, নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনের উপলব্ধি জাগানো, নানাবিধ সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জন এবং তাদের বাঞ্ছিত নতুন সমাজ সৃষ্টির প্রেরণা সঞ্চারই একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব ও লক্ষ্য হওয়া উচিত। শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবতা, বিশ্বভাতৃত্বের চেতনায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মানুষে মানুষে মৈত্রী, প্রীতির মনোভাব এবং মানবাধিকার, দৈহিক শ্রম ও মানবিক মর্যাদার প্রতি সম্মানবোধ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনষ্ক ও আদর্শনিষ্ঠ করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীর মধ্যে মৌলিক নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে হবে, যার ফলে সে সৎ, চরিত্রবান হয়ে ওঠে এবং দুর্নীতি, অন্যায়, অপরাধের বিরম্নদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলিতে নিশ্চিত করতে হবে যেন প্রতিটি শিক্ষার্থী দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সমুন্নত রাখে এবং দেশপ্রেমের ভিত্তিতে বাঙালি জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়।

শিক্ষানীতি প্রণয়নে আমাদের প্রস্তাবনা হচ্ছে::

শিক্ষার মাধ্যম

মাতৃভাষার মাধ্যমেই বুদ্ধি, চিন্তা ও কল্পনাশক্তি সবচেয়ে সহজে বিকশিত হয় এবং জ্ঞানের বিস্তার সহজ হয়। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা পুরোপুরি উল্টো। মাতৃভাষাকে বাদ দিযে অন্য ভাষায় শিক্ষা দান ¯^-¯^ জাতিসত্তার বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে যা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নামান্তর এবং শিক্ষার মূল লক্ষ্যের পরিপন্থি। উচ্চতর স্তরে মাতৃভাষায় বিদেশী ভাষার বই-পুস্তক অনুবাদের কাজে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এ অবস্থায় শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে আমাদের প্রস্তাব-প্রাথমিক পর্যায়ে অবশ্যই প্রত্যেক জাতিসত্ত্বার মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে একটি বিদেশী ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্চতর পর্যায়ে বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের সাথে সাথে উচ্চতর শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সকল গবেষণা কর্ম, প্রতিবেদন মাতৃভাষায় প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইংরেজি ভাষাকে বোধগম্য করার জন্য সহজ পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারে যাতে মাতৃভাষাকে ব্যবহার করা যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা

জন্ম থেকে প্রথম ৫ বছর মানব জীবনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ বয়সেই শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক আচরণ ক্রমবর্ধমান ধারায় এগিয়ে যায়। পরবর্তীকালে পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবন গড়ে ওঠে। মূলত শিশুকে পারিবারিক গণ্ডির বাইরের পরিবেশের সাথে পরিচিত করে তোলাই এই শিক্ষার লক্ষ্য। এর মধ্যে দিযে শিশুদের জ্ঞান আহরণের মনোভাব, সৌন্দর্যবোধ সৃষ্টি ও সুকুমার বৃত্তি জাগিয়ে তুলতে হবে। উপযুক্ত শারীরিক প্রশিক্ষণ, ছবি আঁকা, খেলাধুলা, গল্প বলা ইত্যাদির সাহায্যেই প্রধানত এ শিক্ষা দিতে হবে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ হবে ১-৪ বছর। ৪ বছর বয়সী শিশুদের সংখ্যা নির্ধারণ করে পর্যাপ্ত প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলতে হবে। এ শিক্ষা ব্যবস্থা অবশ্যই অভিন্ন হতে হবে এবং সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সন্তানদের জন্য অবশ্যই একই ব্যবস্থা চালু করতে হবে যাতে করে শৈশব থেকেই একটি শিশুর ওপর প্রচলিত শ্রেণী বৈষম্যের কোনো ছাপ না পড়ে। যে সমস্ত শিশুর বয়স চার বছর পেরিয়ে যাবে তাদেরকে সরাসরি প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হতে হবে। শিক্ষার এই গঠনমূলক স্তরের গুরুত্ব অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থ করতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা

শিক্ষার এই পর্যায় হবে প্রথম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত যা একই সাথে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হবে। এই পর্যায়ে অভিন্ন পাঠ্যক্রম থাকবে। প্রত্যেক ছেলে মেয়ে অবশ্যই প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হবে। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অবশ্যই মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। জাতিগত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের শিশুদের জন্য নিজস্ব ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষার পাঠও প্রয়োজন বোধে গ্রহন করা যেতে পারে। এছাড়া স্মৃতিশক্তির বিকাশ, কল্পনা প্রসার, জ্ঞানার্জনের প্রতি আকর্ষণ ইত্যাদির প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। ক্রীড়া, সংস্কৃতি, গল্প বলা, আবৃত্তি ইত্যাদি বিষযে চর্চার ব্যবস্থা করতে হবে। ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পর্যায়টিতে ইংরেজি শিক্ষা পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভিন্নতর শিক্ষা থাকলেও সেখানে অভিন্ন পাঠ্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে প্রতিটি ছাত্রের বিশেষ কোন বিষয়ের প্রতি ঝোঁক তা নির্ধারণ করতে হবে। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীতে কোনো না কোনো বিষয়ে বিশেষ শিক্ষা সকলকেই গ্রহণ করতে হবে। এর উদ্দেশ্য হবে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও যোগ্যতা-দক্ষতার ক্ষেত্রগুলো নির্দিষ্ট করা এবং একই সাথে যারা বাধ্যতামূলক অবৈতনিক পর্যায়ের পর লেখাপড়া অব্যাহত রাখবে না, তাদের কোনো না কোনো একটা পেশায় নিযুক্ত করার লক্ষ্যে ২ বছরের বৃত্তিমূলক শিক্ষা গ্রহনের জন্য প্রস্তাব করা।

মাধ্যমিক শিক্ষা

শিক্ষা কাঠামোতে প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার সংযোগ বন্ধনী হিসেবে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রচলিত থাকবে। মাধ্যমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে mymgwš^Z ও মানবিক জীবন যাপনের জন্য সচেতন কর্তব্যবোধে উদ্ধুদ্ধ এবং সৎ ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের বিকাশসাধন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যকর জনশক্তি তৈরি করা এবং আগ্রহী, মেধাসম্পন্ন ও বিশেষ প্রবণতা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থী তৈরি করা। নবম-দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পর্যায়কে মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর হিসেবে গণ্য করতে হবে। নবম-দশম শ্রেণী ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী এই দুটি পর্যায়কে একীভূত করতে হবে। নবম ও দশম শ্রেণীতে পাঠ্যক্রম হবে একই ধারার। আর্থিক সঙ্গতির ভিত্তিতে নয় বরং মেধা ও শিক্ষার্থীর আগ্রহ অনুসারে ঐচ্ছিক বিষয় থাকবে। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর প্রাক-স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুসারে উচ্চশিক্ষায় বিশেষ অধ্যয়নের জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। দু’বছর মেয়াদি এই শিক্ষা শেষে মেধা ও যোগ্যতা অনুসারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করবে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় শিক্ষা গ্রহনের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটি হলো ভোকেশনাল বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এসব কারিগরি শিক্ষালয়ে প্রকারভেদে ১/২ বছরের কোর্সের মাধ্যমে নানা ধরনের পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে এবং কোর্স শেষে একজন শিক্ষার্থী সেই পেশায় সরাসরি নিয়োজিত হওয়ার উপযুক্ত হয়ে উঠবে। মাধ্যমিক স্তরের এই কাঠামোকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন যে কেউ চাইলেই বৃত্তিমূলক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর আবারো মাধ্যমিক স্তরে তার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারে।

উচ্চ শিক্ষা

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চ শিক্ষার আবির্ভাব ও বিকাশ ¯^ZtùzZ©fv‡e উচ্চশিক্ষার ধারণাগত জায়গাটি নির্মাণ করেছে। উচ্চশিক্ষা বলতে মূলত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকেই বোঝানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটির মধ্যেই এর ধারণা নিহিত। কোন ধরনের পূর্ব ধারণার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সপ্রশ্ন বিশ্ববিদ্যা আয়ত্ত করা, অবাধ মুক্তবুদ্ধি চর্চা, প্রগতিশীল ধ্যানধারণা নির্মাণ করা অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান সংরক্ষণ এবং জ্ঞান সৃষ্টিই বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাগত জায়গা। উচ্চশিক্ষার ভূমিকা হচ্ছে (ক) বিভিন্ন উচ্চতর কাজের জন্য জ্ঞানদক্ষ ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ তৈরি করা এবং কর্মানুরাগ, জ্ঞানস্পৃহা, চিন্তার ¯^vaxbZv, ন্যায়বোধ ও মানবিক মূল্যবোধ বিকশিত করা (খ) গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা (গ) সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাবলির বিশ্লেষণ ও সমাধানের পথ নির্দেশ করা। বিজ্ঞান্‌-প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প, অর্থনীতি ও অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। সামপ্রতিক সময়ে এর সাথে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার ও বিশ্বজগত সম্পর্কে অভিনব উপলব্ধি। জ্ঞানের খণ্ডিকরণ প্রক্রিয়ায় বিশেষায়ত উচ্চশিক্ষা অন্ধ আনুগত্য শেখাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই জ্ঞানের জগতে সকল বিচ্ছিন্নতা ও বিভক্তি অতিক্রম করে সার্বিক mgš^q সাধন জরুরি হয়ে পড়েছে।

তাই এ বিষয়ে আমাদের প্রস্তাবনা- প্রচলিত বৈষম্যমুলক পাস কোর্স তুলে দিয়ে ৪ বছর মেয়াদী স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাকে একই ধারায় নিয়ে আসতে হবে। উচ্চ শিক্ষার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচী হবে বিশ্বজনীন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহে বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠোমোগত সুবিধা বৃদ্ধি, পাঠ্যসূচী পুনঃনির্ধারণ, পর্যায়ক্রমে গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানটির ক্ষেত্রে দুর্নীতি অব্যবস্থাপনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, তা দূর করতে অবিলম্বে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। সেশনজট দূরীকরণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষার ফল প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে হবে। গবেষণার কাজে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরকে একযোগে অংশগ্রহণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় সমুহে গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। শুধুমাত্র ক্লাস রুমই শেখার স্থান এ প্রবণতা পরিহার করে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা, রাজনৈতিক ভাবনা, ছাত্র শিক্ষক মিথস্ক্রিয়া ইত্যদির মাধ্যমে বৃহত্তম সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি করতে হবে। সকল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ৭৩ অধ্যাদেশের আলোকে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। সেখানে খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ সবার মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মাধ্যমিক স্তরের পর আর্থিক সঙ্গতির সাথে mgš^q রেখে বিশেষায়িত কোর্সে ডিপ্লোমা করার ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। এর মেয়াদ হবে ৩ বছর। উচ্চ স্তরের এই কাঠামোকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন যে কেউ চাইলেই ডিপ্লোমা শিক্ষা সমাপ্ত করার পর আবারো স্নাতক পর্যায়ে তার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারে।

শিক্ষার কাঠামোগত উপরোক্ত প্রস্তাবনার সাথে সাথে আরো কতক বিশেষায়িত বিষয়ে আমাদের প্রস্তাবনা হলো:

কৃষি শিক্ষা

আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, জমি ও মানুষের কারণে আমাদের অর্থনীতিতে কৃষি উৎপাদনের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের জ্ঞানভাণ্ডারে ক্রমাগত যে বিস্ফোরণ ঘটছে আমাদের ভবিষ্যৎ কৃষকদের সরাসরি তার সঙ্গে যুক্ত করতে কৃষি শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত। পর্যায়ক্রমে দেশের ব্যাপক সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে কৃষি শিক্ষার আওতায় আনতে হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতি সাধনের জন্য এটা অপরিহার্য। কৃষি শিক্ষাকে কেবল মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বস্তরে ব্যাপকভাবে কৃষি সম্পর্কিত শিক্ষা চালু করতে হবে।



চিকিৎসা শিক্ষা

গণমুখী ¯^v¯’¨e¨e¯’vi প্রয়োজন পুরণে আমাদের বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থা অক্ষম। বর্তমানে হাসপাতাল কেন্দ্রিক নিরাময়মূলক চিকিৎসার ওপর অতিরিক্ত জোর দেয়া হয়েছে, অথচ সে তুলনায় প্রতিরোধমুলক শিক্ষা এবং কমিউনিটি মেডিসিনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি। বর্তমানে দেশের চিকিৎসক, সেবক সেবিকা ও অন্যান্য ¯^v¯’¨Kgx©i সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত অপ্রতুল। সেজন্য চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমাদের প্রস্তাবনা হচ্ছে- মেডিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট খুলতে হবে। মেডিকেল কলেজসমূহকে ¯^vqZ¡kvwmZ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। এ শিক্ষায় প্রতিনিয়তই জ্ঞানের পরিধি বাড়ছে, এর সাথে সামঞ্জস্য রাখার জন্য প্রত্যেক চিকিসৎসকের অব্যাহত শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। গবেষণাধর্মী স্নাতকোত্তর শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ¯^v¯’¨ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রোগ প্রতিরোধ। সে লক্ষ্যের দিকেই খেয়াল রেখে রোগ প্রতিরোধমূলক ও কমিউনিটি মেডিসিন চিকিৎসা শিক্ষার ওপর অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সাথে আনুপাতিক হারে সেবা শিক্ষা, মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং, টেকনিশিয়ান ইত্যাদি বৃদ্ধির ও সুশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অলটার্নেটিভ মেডিসিন, হোমিওপ্যাথ, ইউনানী, আয়ুর্বেদীয়, ন্যাচারোপ্যাথী ইত্যাদির বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নতি ও প্রসার ঘটাতে হবে।

প্রকৌশল শিক্ষা

অর্থনেতিক পরিকল্পনার সাথে প্রকৌশল শিক্ষার পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য বিধান একান্ত প্রয়োজন। দেশের চাহিদা অনুযায়ী প্রকৌশল শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য আসনসংখ্যা নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা কোর্সগুলোকে অধিকতর ফলপ্রসূ করার জন্য শিল্পকারখানা ও কারিগরি সংস্থাসমূহে ছাত্রদের ইন্টার্নশিপ চালু করতে হবে। সরকারি প্রজেক্টগুলোতে ছাত্রদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৌশলী প্রযুক্তিবিদদের দেশে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে যাতে মেধা পাচারের সুযোগ তৈরি না হয়।

আইন শিক্ষা

আমাদের উচ্চতর যোগ্যতা এবং উন্নত চরিত্রসম্পন্ন আইনজ্ঞ দরকার। আমরা এমন সমর্থ এবং ধীশক্তি সম্পন্ন আইনজ্ঞ চাই, যারা ন্যায় বিচার প্রদর্শন করতে পারবেন। এজন্য সমসাময়িক অর্থনেতিক, রাজনৈতিক এবং আদর্শগত শক্তির প্রভাব অনুধাবন করার মতো আইন ক্ষেত্রে ব্যাপক এবং উদার শিক্ষাপ্রাপ্ত ও জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির প্রয়োজন। আইনশিক্ষা দেশের আইনের শাসন বহাল রাখার ব্যাপারে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিষয়ে প্রস্তাবনা হচ্ছে ব্যবহারিক ও প্রয়োগমুখী আইন শিক্ষাদানের দায়িত্ব অনতিবিলম্বে গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং যতদিন উক্ত কাউন্সিল তা না নিতে পারবেন, ততদিন পর্যন্ত সে দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়সমহূকে পালন করতে হবে। আইন কলেজগুলোর ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকমণ্ডলী, গৃহ ও স্থান এবং পাঠাগার ইত্যাদির ভিত্তিতে আনুপাতিকভাবে ছাত্র সংখ্যা সীমিত করতে হবে। বর্তমানে প্রচলিত তিন বছরের আইন কোর্সের (এলএলবি ক্লাস) জন্য পর্যাপ্ত সংখক মুট কোর্ট এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে। আইনশিক্ষাকে গবেষণামুখী করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে আইনে ডিগ্রী-উত্তর শিক্ষা ব্যবস্থায় গবেষণার উপর বিশেষ জোর দিতে হবে।

ললিতকলা শিক্ষা

দেশের সামগ্রিক শিক্ষা প্রকল্পে ললিতকলা শিক্ষাদান ব্যবস্থা প্রধানত দুটি উদ্দেশ্য সাধন করে। প্রথমত ললিতকলা শিক্ষা একটি জাতিকে অধিকতর সংস্কৃতিবান জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে সাাহায্য করে। দ্বিতীয়ত দেশের মানুষের ভেতরে সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত ও বর্ধিত করার মাধ্যমে তার সর্বাঙ্গীন বিকাশে সাহায্য করে। ললিতকলা শিক্ষাকে যথার্থভাবে বিকশিত করতে একটি সঠিক কার্যক্রমের প্রয়োজন হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের বয়স সামর্থ্য ও রুচি অনুযায়ী একটি বিজ্ঞানসম্মত পাঠ্যসূচী প্রণয়ন করতে হবে। যা বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের ক্ষেত্রে দেশের ঐতিহ্য বজায় রাখার সঙ্গে সঙ্গে বহির্বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে শৈল্পিক যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। দেশের গণমানুষের সংস্কৃতি উপেক্ষা করে কেবলমাত্র নাগরিক সংস্কৃতির প্রতিফলন যেন না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। শিল্পের সাথে মানুষের, মানুষের জীবন সংগ্রামের উৎপাদন সম্পর্কে যে যোগসুত্র ঐতিহাসিকভাবে স্থাপিত হয়েছে, তাকে বিচ্ছিন্ন করে শুধুমাত্র শিল্পের জন্য শিল্প, এ জাতীয় প্রবণতাকে তত্ত্বগতভাবে মোকাবেলা করে শিল্পের প্রকৃত রূপ তুলে ধরতে হবে।

খেলাধুলা ও বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা

দেশের সকল নাগরিকই যাতে সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম হয়ে গড়ে উঠতে পারে তার জন্য শিশু শিক্ষালয় থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে শরীর চর্চা হবে বাধ্যতামূলক। যারা খেলাধুলা উচ্চশিক্ষা নিতে চায় তাদের জন্য খেলাধুলার ওপর উচ্চতর কোর্স চালু করতে হবে। দেশের সর্বত্র বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত মাঠ, খেলাধুলার সাজ-সরঞ্জাম ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। দশম শ্রেণীর পর শারীরিকভাবে সক্ষম শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা নিতে হবে।

বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা

ব্যক্তিক মানবিক উৎকর্ষ সাধনের বাইরেও শিক্ষার আরেকটি প্রায়োগিক দিক থাকে। আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণপূর্বক দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তর করার জন্য মাধ্যমিক স্তরের পর বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে শিক্ষার এ স্তরে শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও প্রবণতা অনুযায়ী তার বিষয় নির্ধারণের পাশাপাশি ভাষা, ইতিহাস ও ভূগোলের বাধ্যতামুলক একটি কোর্স থাকতে হবে। দক্ষ কারিগরি জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য বর্তমানে প্রচলিত ডিপ্লোমা শিক্ষাকে যুযোপযোগী এবং বিকাশমান করতে হবে। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহ থেকে উত্তীর্ণ মেধাবী ছাত্রদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের দ্বার উন্মুক্ত রাখতে হবে। দেশের সর্ববৃহৎ শিল্প- বস্ত্র ও পাট শিল্পের প্রসারের লক্ষ্যে বস্ত্র ও কারিগরি মহাবিদ্যালয়কে আরো কার্যকর ও বিকাশমান প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে দেশে যে শিল্প ও প্রকৌশল খাত রয়েছে তার চাহিদার নিরিখে পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন ঘটাতে হবে।

নারীশিক্ষা

ভোগবাদী দর্শনের প্রভাবে পণ্য মানসিকতায় নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচনা, গৃহপালিত হিসেবে ব্যবহার অথবা নারী পুরুষের দু’টি ভিন্ন পথ তৈরি করা বুর্জোয়া রাজনৈতিক মতাদর্শের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অনেকদিন ধরে। যার কারণে সামাজিক কাঠামোতে আরেকটি বৈষম্য তৈরি করা হয় এবং সে বৈষম্যের শিকার হয়ে নারী সমাজ, যা মানব সমাজের এক অপরিহার্য অংশ অবহেলিত এবং পিছিয়ে পড়া জাতিতে পরিণত হয়। লিঙ্গীয় বৈষম্য দুর করে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তার শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে নারী শিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নারী শিক্ষাকে কার্যকর করার জন্য পাঠ্যসূচিতে নারীকে সম্মানজনক উপস্থাপন নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র নারীর নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে হবে, নারীর অর্থনৈতিক সঙ্কট দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিক্ষা

গণতন্ত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাবনায় বিলুপ্ত করেছে মানবিক সমাজ গঠনের লড়াইয়ের সাথী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে। আরোপ করেছে নীতি-নির্ধারকের সংস্কৃতি। লিখিত ইতিহাস তাদেরই ইতিহাস যারা লিখতে পেরেছেন অথবা লেখককে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন। নিজের ভাষা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি হারিয়ে তথাকথিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে গিয়ে নিজেদেরকেই হারিয়ে ফেলছে আমাদের দেশের লড়াকু ঐতিহ্যর ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো, যা শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর্বে শিক্ষা ক্ষেত্রে এ বৈষম্য দুর করার জন্য যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন তা হলো : সকল জাতিসত্তার মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে অবশ্যই সমান গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরতে হবে। শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত ¯^-¯^ জাতির শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকতে হবে। পাঠ্যসূচীতে, প্রকাশনায় প্রচলিত মতাদর্শের বিপরীতে সঠিক ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন উপস্থাপন করতে হবে।

প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা

সাধারণত পিতামাতার বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে এবং অসতর্কতার কারণেই সন্তানরা প্রতিবন্ধী হয়। এরপরও প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে যেভাবে প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় সে সম্পর্কেও প্রশ্ন থেকে যায়। কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী, কেউবা মানসিক প্রতিবন্ধী। শিক্ষানীতি এমন হতে হবে যাতে যার যার সমস্যা অনুধাবন করে তার মতো করে তার যাবতীয় সুপ্ত প্রতিভার বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে মূলনীতি হবে, কোনোভাবেই একজন প্রতিবন্ধীকে সামাজিকভাবে হেয় করা যাবে না এবং অবশ্যই তাদের মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।

শিক্ষার অর্থায়ন

শিক্ষা মৌলিক অধিকার, সকলের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিতে হবে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষাখাতে জাতীয় আয়ের ৮ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করতে এবং মাধ্যমিক শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার স্তরে আর্থিক সঙ্কটের কারণে যাতে শিক্ষাগ্রহণ বন্ধ না হয়ে যায় তার জন্য বৃত্তি, উপবৃত্তি প্রকল্প চালু করতে হবে।

সমাজের সকল স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত রাখতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে শিক্ষার নিম্ন পর্যায়ের নানা ধারার বৈষম্যপূর্ণ অবস্থা ভেঙ্গে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই উচ্চ শিক্ষার দ্বার পর্যন্ত পৌছতে পারে না বা পৌছলেও অনেক সময় দেখা যায় উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয় প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না। শিক্ষার অর্থায়নে এটি নিশ্চিত করতে হবে, নানা ধরণের প্রতিযোগিতার মধ্যদিয়ে যারা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে তারা যেন কোনোভাবেই অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত না হয়। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থে অপ্রতুলতা রয়ে‡Q‌। বরাদ্দের খুব সামান্য অংশই ব্যয় হয় গবেষণাসহ শিক্ষা উন্নয়ন খাতে। শিক্ষা উন্নয়ন খাতে আরো প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। শিক্ষার নিম্নস্তরগুলোতে সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকায় ঝরে পড়তে বাধ্য হচ্ছে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষা খাতের যাবতীয় অতিরিক্ত বরাদ্দ নিম্নস্তরের শিক্ষা কাঠামোর ভিত্তি মজবুত করতে ব্যয় করা উচিত।

আগেই আলোচনায় এসেছে উচ্চশিক্ষার জন্য বর্ধিত অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু এই অর্থ কিভাবে সংস্থান করা হবে? এই সমস্যাকে সামনে রেখে উচ্চশিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণে ছাত্রবেতন বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় এ পরিত্থিতি সমাধান করার চেষ্টা চলছে। যা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এতে শিক্ষাকে একটি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ¯^xK…wZ দেয়া হয় অর্থাৎ অর্থ যার শিক্ষা তার। এতে উচ্চশিক্ষার মৌলিক ধারণা পুরোপুরি ক্ষুbœ হয়। এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ নিgœবিত্ত মানুষের অংশগ্রহণের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তাই ছাত্র বেতনের-ফিÕর পরিমাণ বর্তমান অব¯’v থেকে কোনোভাবেই বৃদ্ধি করা চলবে না। শিক্ষা উbœয়ন, গবেষণা খাতে রাóªxয় ব্যয়ের পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থায়নে বিত্তশালীদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক শিক্ষা কর আদায় করতে হবে।

লোকায়ত জ্ঞান mgš^q : চর্চা

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামোর বাইরে লুকিয়ে থাকা গণমানুষের অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান mgwš^Z করার মাধ্যমে এবং তার বিজ্ঞানসম্মত বিকাশের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামোকে ঋদ্ধ করতে হবে।

পরীক্ষা ও মুল্যায়ন পদ্ধতি

শিক্ষাক্ষেত্রে পরীক্ষার প্রশ্নটিও এসেছিল শিক্ষার্থীর বিকশিত হওয়ার প্রক্রিয়া পরখ করে নেয়ার জন্য। পরীক্ষার উদ্দেশ্য একজন শিক্ষার্থী কতটুকু জ্ঞান উপলব্ধির মাধ্যমে আয়ত্ত করেছে এবং জীবনে ও সমাজে প্রয়োগক্ষমতা কী মাত্রায় লাভ করেছে তা নিম্নরূপ করা এবং সে অনুযায়ী তার ¯^xK…wZ দেয়া। পরীক্ষা পদ্ধতির আরো একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেয়ার পাশাপাশি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থারও পরীক্ষা নেয়া হয়। কারণ শিক্ষার্থীর শিক্ষালাভ শুধুমাত্র তার একক প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করে না। শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার সিলেবাস, শিক্ষকদের নৈতিকমান, ক্ষমতাসীনদের কাছে শিক্ষার গুরুত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষা কাঠামো ইত্যাদি বিষয়গুলো তার সাথে যুক্ত। এজন্য বর্তমানে প্রচলিত আনুষ্ঠানিক বহিঃপরীক্ষার পাশাপাশি অন্তঃপরীক্ষার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকরা যাতে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেন এবং মূল্যায়নে সমমান বজায় থাকে তার জন্য শিক্ষকদের আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে গভীর ও নির্ভুল ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকতে হবে এবং বিষয় সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের মেধার স্তর বিবেচনা করতে হবে, তেমনি এর লক্ষ্য হওয়া উচিৎ শিক্ষার্থীদের মৌলিক সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তিকে উন্নত করা।

শিক্ষা প্রশাসন

শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাকে বর্তমান সরকারি আমলাতান্ত্রিকতার বাইরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে। সমাজের সাথে এর সম্পৃ্‌ক্ততা বৃদ্ধি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণ ও ¯^vqËkvmb, শিক্ষকদের ¯^-g~j¨vqb এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।



শিক্ষকের মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্ব

শিক্ষকতা পেশার বর্তমান হাল এতই খারাপ যে সাধারণত যোগ্যতম ব্যক্তিরা এই পেশার প্রতি কোনো আকর্ষণ বোধ করেন না। প্রথমেই আসে বেতন ভাতাসহ সুযোগ সুবিধার কথা। এদিক থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তুলনায় অধিকতর বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা পেলেও অন্যান্য পেশার তুলনায় সামাজিকভাবে সরকারি-বেসরকারি নির্বেশেষে সকল সমযোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকরা সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে অনেক নিচে পড়ে আছেন। তাদের কাজের শর্তাবলী হতাশাব্যঞ্জক, শিক্ষাদানের পরিবেশ অনুকূল নয়। গণতান্ত্রিক চাকুরিবিধি না থাকায় পেশাগত ¯^vaxbZvmn সমস্ত মৌলিক নাগরিক অধিকার ভোগ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে তাদের সৃজনশীলতা বিকশিত হচ্ছে না। আকর্ষণীয় এই পেশায় বর্তমানে যারা কর্মরত আছেন, পরিবেশগত কারণেই তাদের মান ক্রমশ নিম্নাভিমুখী হচ্ছে। বেঁচে থাকার তাগিদে এক সময়ে টিউশনি নিলেও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের চাইতে টিউশনি, গ্রুপ কোচিং ইত্যাদিতে অধিকতর সময় ও শ্রমশক্তি ব্যয় ও প্রশাসনের মারাত্মক দুর্নীতির প্রভাব শিক্ষক সমাজের একাংশকে কলুষিত করছে। ফলে শিক্ষকদের দায়িত্ববোধও ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। শিক্ষকদের মর্যাদা ভূ-লুণ্ঠিত হচ্ছে। শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থা, বৈষয়িক সুযোগ সুবিধা, কাজের উন্নত শর্তাবলি, মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা, পেশাগত ¯^vaxbZv, সুষ্ঠু শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং শিক্ষদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত দায়িত্ব সচেতনতা ও নিষ্ঠা।

শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের অভিমত হচেছ যে ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার সম্মেলনে গৃহিত শিক্ষকদের মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিসের আলোক আমাদের দেশের বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করতে হবে।

শিক্ষার্থী- শিক্ষক অনুপাত

বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষাথী শিক্ষকের সুনির্দিষ্ট কোন অনুপাত নেই। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শিক্ষার্থী-শিক্ষকের বিজ্ঞানসমম্মত অনুপাতটি গ্রহণ করা যেতে পারে।

(ক) বাধ্যতামূলক স্তরে ২৫-১

(খ) মাধ্যমিক স্তরে ২০-১

(গ) উচ্চ শিক্ষা স্তরে ১০-১

আমাদের বর্তমান আর্থ সামাজিক বাস্তবতায উক্ত অনুপাতের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা গ্রহণ করা গেলেও পর্যায়ক্রমে উক্ত অনুপাতটির দিকে অগ্রসর হতে হবে।

ছুটি সংক্রান্ত

পরিকল্পিত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় পরিচালিত হওয়া উচিত। বর্তমানে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোপরি সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে তার একটি উদাহরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি সংক্রান্ত নীতিমালা। শিক্ষার্থীর প্রযোজন, স্থানিক চাহিদার কোনোকিছু বিবেচনা না করে অপ্রয়োজনীয় ছুটি দেয়া হয়, যে কারণে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। মাঝে মাঝে একটানা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়। এসব সমস্যা বিবেচনা করে আমরা প্রস্তাব করছি- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বছরে দু’বার বড় ছুটি থাকবে। শিক্ষার্থী যেন ছুটির এ সময়কে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের অধিকার

শিক্ষাক্ষেত্রে শ্রেণীবৈষম্য দূর করে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর সুযোগ-সুবিধার সমতা বিধান করতে হবে। দরিদ্র, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা নারী হওয়ার কারণে কেউ যেন প্রতিভা বিকাশ ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। ¯^íg~‡j¨ পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা কর্মসূচী সফল করার লক্ষ্যে মধ্যাহ্নকালীন আহার ও ¯^íg~‡j¨ স্কুল ইউনিফর্ম সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। বিনামূল্যে পাঠ্য বই সরবরাহের সুযোগ µgvš^‡q ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রসারিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের কনসেশন মূল্যে পরিবহন সুবিধা দিতে হবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থার সুযোগ আরো সমপ্রসারিত ও উন্নত করতে হবে। ছাত্রাবাসের সুযোগ সুবিধা আরো বাড়াতে হবে এবং মানের উন্নতি সাধন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিনামুল্যে নিয়মিত মেডিকেল চেক-আপ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। নবম শ্রেণী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত ছাত্রদের সংসদ গঠনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি বছর গণতান্ত্রিক পন্থায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে।

নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বয়স্কশিক্ষা ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা

একটি ঐক্যবদ্ধ সচেতন সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে। স্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্রে ছুটির পুনর্বিন্যাস করে দীর্ঘ ছুটির এবং চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষে ছাত্রদের খণ্ডকালীন এবং শিক্ষিত বেকার যুবকদের অন্তবর্তীকালীন সম্মানী ভাতাসহ শিক্ষক নিয়োগ করা যেতে পারে। নারী সমাজের নিরক্ষরতা দূরীকরণে নারী সংগঠনগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। একইভাবে কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণে যথাক্রমে কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। প্রত্যেক গ্রামে স্থানীয় স্কুলে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। নিরক্ষর জনগোষ্ঠী যাতে লেখাপড়া শিখতে আগ্রহী হয় তার জন্য শিক্ষা কর্মসূচির মধ্যে জীবন ও জীবিকার সাথে সম্পৃক্ত কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ¯^v¶iZv অর্জনের পর আবার যাতে কেউ চর্চার অভাবে নিরক্ষর না হয়ে পড়ে তার জন্য এই শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে।

একটি ছাত্র সংগঠন হিসেবে আমাদের প্রধানতম দায়িত্ব শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সংগঠিত করা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাকাঠামো অগ্রসর হওয়ার সূচনালগ্ন থেকেই এর ওপর যে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়েছিল, যা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে আজ অবধি; ছাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠার ¯^v‡_© তাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা প্রয়োজন। জন্মক্ষণ থেকেই আমাদের সংগঠন সেই প্রযোজন মেটাতে লড়াই পরিচালনা করে আসছে, বারবার দাবি তুলেছে একটি পরিকল্পিত গণমুখী, বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষানীতির। বাংলাদেশ ¯^vaxb হওয়ার অব্যবহতি পরে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নই প্রথম ১৯৭২ সালে একটি বৈজ্ঞানিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সহজলভ্য গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার খসড়া প্রস্তাবনা উত্থাপন করে। ১৪ই জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে সংগঠনের উদ্যোগে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। শিক্ষা কমিশনের ১ম সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৭ই জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে। পরে বিশেষজ্ঞ মহলের মতামত নিয়ে পুর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি ৯-১১ এপ্রিল সংগঠনের ত্রয়োদশ জাতীয় সম্মেলনে উত্থাপন করা হয় এবং আলোচনার পর গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে এবং সর্বশেষ ২০০৪ সালে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে আবারো উত্থাপন করা হয় একটি বিকল্প শিক্ষানীতি প্রস্তাবনা। ২০০৪ সালে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি শিক্ষানীতির প্রস্তাবনা তৎকালীন সরকারের কাছে পেশ করা হয়। কিন্তু অধরাই থেকে যায় ছাত্রসমাজের দীর্ঘকালের এই ন্যায্য দাবি। অথচ ’৯০-এর গণ আন্দোলনের সকল রাজনৈতিক শক্তি দেশবাসীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন একটি গণমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি প্রণয়নের। সে প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়িত হয়নি। যার অনিবার্য ফলাফল হিসেবে অপরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি দিন। এই বাস্তবতায় আমরা মনে করেছি, সমাজের সকল চেতন অংশকে সাথে নিয়ে গণমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক একটি পরিকল্পিত শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা হাজির করা আবশ্যক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন